শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপিড়ন: নিরাপদ শৈশব ও শিক্ষকতার মর্যাদা রক্ষায় আপসহীন পদক্ষেপ

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো মানুষ গড়ার কারিগর তৈরির পবিত্র স্থান। কিন্তু ইদানিং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশেষকরে মাদরাসা পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপিড়নের যেসব অভিযোগ উঠছে, তা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, বরং পুরো জাতির জন্য এক অশনি সংকেত। যখন একজন শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের বিরুদ্ধে লালসার অভিযোগ ওঠে, তখন শুধু একটি শিশু বা নারী ক্ষতবিক্ষত হয় না, বরং ধসে পড়ে সমাজের নৈতিক ভিত্তি।
বিচারের সংস্কৃতি ও বিচারহীনতার অভিশাপ
যৌন সহিংসতার লাগাম টেনে ধরতে না পারার অন্যতম কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। ফেনীর নুসরাত জাহান রাফি হত্যার ঘটনায় যদি অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার মতো অপরাধীদের তাৎক্ষণিক বিচার নিশ্চিত করা যেত, সেনানিবাসের অভ্যন্তরে সোহাগী জাহান তনুর মতো হত্যাকাণ্ড ও লাঞ্ছনার যখন সঠিক তদন্ত ও বিচার হয় না, তখন অপরাধীরা আশকারা পায়। প্রতিটি অপরাধীকে যদি যথাসময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা যেত, তবে অপরাধের গ্রাফ নিশ্চিতভাবেই নিম্নমুখী হতো। বিচার ঝুলে থাকা মানেই নতুন অপরাধীর জন্ম দেওয়া
প্রকৃত অপরাধী বনাম পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র: সত্যের অনুসন্ধান
যৌন নিপিড়নের অভিযোগ উঠলে দুটি দিক অত্যন্ত সতর্কতার সাথে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, যদি অভিযোগ সত্য হয়, তবে সেই অপরাধী মানুষ নামের কলঙ্ক। দ্বিতীয়ত, অনেক সময় ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে শিক্ষকদের পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানোর ঘটনাও ঘটে। তাই আমাদের দাবি হলো সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত। একজন নিরপরাধ শিক্ষক যেন ষড়যন্ত্রের শিকার না হন, আবার একজন প্রকৃত অপরাধী যেন প্রভাব খাটিয়ে পার না পেয়ে যায়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও নৈতিক অবক্ষয়
বিশেষ করে মাদরাসাগুলোতে বালিকা শিক্ষার্থীদের হেনস্তার খবর অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ইসলামের মহান শিক্ষা এবং আলেম সমাজের প্রতি সাধারণ মানুষের মনে এর ফলে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। ফেনীর নুসরাত হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলোতে যখন সিরাজ উদ দৌলার মতো কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান জড়িত থাকে, তখন তা গোটা সমাজের বিচারব্যবস্থার দিকে আঙুল তোলে। বছরের পর বছর বিচার ঝুলে থাকা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে।

কঠোর সংস্কার ও শাস্তির প্রস্তাবনা
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন:
দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি: অভিযোগ ওঠার ৩ থেকে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে স্বচ্ছ তদন্ত শেষ করতে হবে। প্রয়োজনে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং চাকরি থেকে স্থায়ী বহিষ্কারের বিধান রাখা চাই।
আলাদা রিহ্যাব ও সামাজিক নির্বাসন: এসব অপরাধীদের জন্য বিশেষ সংশোধন কেন্দ্র বা রিহ্যাব তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে তাদের কঠোর নিয়মে অন্তত ৩ থেকে ৫ বছর বাধ্যতামূলক থাকতে হবে। মুক্তি পাওয়ার পর তারা যেন অন্য কোনো সেক্টরে আর কাজ করতে না পারে, সেই আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বুনিয়াদি কোর্স ও প্রশিক্ষণ: সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নারীর প্রতি যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখানোর বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষাকে প্রতিটি সেক্টরে বাধ্যতামূলক ‘বুনিয়াদি কোর্স’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

একটি ফুল ঝরে যাওয়ার আগে যেমন বাগান মালিকে সজাগ হতে হয়, তেমনি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিপিড়নের শিকার হওয়ার আগেই সমাজ ও রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা রক্ষা করা কোনো একক ব্যক্তির দায়িত্ব নয়, এটি একটি সামষ্টিক লড়াই। অপরাধীর পরিচয় যাই হোক—শিক্ষক, অধ্যক্ষ বা প্রভাবশালী—বিচারের কাঠগড়ায় সবাই যেন সমান হয়। শৈশব হোক নির্ভয়, আর প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হোক নৈতিকতার আলোকবর্তিকা। তবেই আমাদের সন্তানরা একটি সুস্থ ও সুন্দর পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবে।
সোহান শাহরিয়ার
শিক্ষক