ডিজিটাল আসক্তির জালে দুই প্রজন্ম

  • ডিজিটাল আসক্তির জালে দুই প্রজন্ম: তরুণদের সম্ভাবনা ও বয়াবৃদ্ধদের প্রশান্তি যেখানে বিপন্ন
    স্মার্টফোন আমাদের জীবনের হাতিয়ার, জীবনের নিয়ন্ত্রক নয়
    লেখক: একজন তরুণ শিক্ষক | বিষয়: সামাজিক জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্য
    “যে সময়টুকু ব্যয় হওয়ার কথা ছিল তরুণদের জ্ঞানচর্চা, দক্ষতা উন্নয়ন ও স্বপ্ন পূরণের পেছনে, আর বয়োবৃদ্ধদের আত্মিক প্রশান্তি ও পরিবারকে সময় দেয়ার কাজে—তা আজ গ্রাস করে নিচ্ছে হাতের পাঁচ ইঞ্চির স্ক্রিন।”
    আধুনিক প্রযুক্তির বিস্ময়কর আবিষ্কার ‘স্মার্টফোন’ আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। তথ্যের অবাধ প্রবাহ, দ্রুত যোগাযোগ এবং বিনোদনের অগণিত মাধ্যম নিয়ে এই ছোট ডিভাইসটি আমাদের হাতের মুঠোয় বিশ্বকে এনে দিয়েছে। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠের মতো, এর অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার আমাদের সমাজে সৃষ্টি করছে এক নীরব সংকট। এই সংকটের শিকার কেবল কোমলমতি শিশু বা তরুণ সমাজই নয়; ইদানীং আমাদের শ্রদ্ধেয় বয়োবৃদ্ধেরাও এই ডিজিটাল ফাঁদে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ছেন। একজন তরুণ শিক্ষক হিসেবে সমাজ ও দুই প্রজন্মের এই মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক অবক্ষয় আমাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
    তরুণদের কর্মক্ষমতা ও সৃজনশীলতার অবক্ষয়
    তরুণ সমাজ একটি দেশের প্রাণশক্তি। অথচ অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে আজ তাদের কর্মক্ষমতা ও চিন্তাশক্তি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সারাদিন চোখ লাল করে স্ক্রলিং, রিলস আর শর্ট ভিডিওর মোহ তরুণদের ধৈর্য ও গভীর মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা (Attention Span) কমিয়ে দিচ্ছে। বই পড়ার অভ্যাস আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের সৃজনশীলতা ও মৌলিক চিন্তা করার ক্ষমতার ওপর। আমরা আগের মতো নতুন কোনো উদীয়মান লেখক, চিন্তাবিদ বা গবেষক গড়ে উঠতে দেখছি না।
    মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ফলাফলের ধারাবাহিক বিপর্যয়ের পেছনেও অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে এই অনিয়ন্ত্রিত স্ক্রিন টাইম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অযথা সময় নষ্ট হওয়ায় লক্ষ্যভিত্তিক পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে তারা।
    তরুণদের অতিরিক্ত আসক্তির প্রধান নেতিবাচক প্রভাবসমূহ:
    মনোযোগ ও পড়াশোনায় ব্যাঘাত: পড়ার টেবিলেও ফোনের নোটিফিকেশন মনকে বিচ্যুত করে, ফলে গভীর শিখন বাধাগ্রস্ত হয়।
    মানসিক অস্থিরতা ও হীনম্মন্যতা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কৃত্রিম জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করে তরুণদের মধ্যে হতাশা ও হীনম্মন্যতা জন্ম নিচ্ছে।
    শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা: মাঠের খেলাধুলা ও শারীরিক পরিশ্রম কমে গিয়ে অলস জীবনযাপন তৈরি হচ্ছে, যা অকাল স্থূলতা ও শারীরিক দুর্বলতা আনছে।
    সময় ও মেধার অপচয়: মূল্যবান তরুণ বয়স অজান্তেই রিলস, ভিডিও গেম আর অপ্রয়োজনীয় কনটেন্ট দেখে পার হয়ে যাচ্ছে।
    নিরাপত্তা ঝুঁকি: অনলাইন প্রতারণা, ভুয়া তথ্য, সাইবার বুলিং ও ক্ষতিকর কনটেন্টের আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি।
    তরুণদের প্রতি বার্তা ও উপার্জনের সুস্থ ধারা
    বর্তমান সময়ে তরুণেরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ফ্রিল্যান্সিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন বা ই-কমার্সের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের খাত তৈরি করছে—যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে উপার্জনের নামে কিংবা সাময়িক ভিউ-লাইকের আশায় নিজের ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা ও কৃষ্টি বিসর্জন দিয়ে সস্তা বা বিতর্কিত কনটেন্ট তৈরি করা থেকে বিরত থাকাই উত্তম। তরুণ বয়সের আসল বিনিয়োগ হলো জ্ঞান, দক্ষতা, সুস্থ শরীর ও ইতিবাচক সম্পর্ক গঠন।
    বয়োবৃদ্ধদের জীবনে স্মার্টফোনের নীরব থাবা
    জীবনপ্রাহ্ণে এসে আমাদের শ্রদ্ধেয় বয়োবৃদ্ধগণ সময় কাটানোর এক সহজ অনুসঙ্গ হিসেবে বেছে নিয়েছেন এই স্মার্টফোনকে। আপাতদৃষ্টিতে এটি নিঃসঙ্গতা দূর করার উপায় মনে হলেও, বাস্তবিক অর্থে এটি তাদের শারীরিক ও আত্মিক জীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
    অনেক বয়োবৃদ্ধই বুঝতে পারছেন না যে, রাতের পর রাত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা তাদের কতখানি ক্ষতি করছে। ইবাদত-বন্দেগি ও আত্মিক অনুশীলনে যে একাগ্রতা প্রয়োজন, ফোনের নোটিফিকেশন আর অহেতুক স্ক্রলিং সেখানে চরম বাধা সৃষ্টি করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইবাদত করলেও অনর্থক ডিজিটাল বিনোদনে সময় নষ্ট করা সেই ইবাদতের প্রভাবকে নিষ্ফল করে দিচ্ছে—যা যেন এক ‘ফুটো বালতি’র মতো, যেখানে ভালো কাজের সওয়াব ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
    এছাড়াও, বয়োবৃদ্ধদের নিজস্ব চিন্তা প্রকাশের মাধ্যমে লেখালেখি বা খোশগল্পের যে ঐতিহ্যবাহী স্বভাব ছিল, তা আজ প্রযুক্তির তলে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
    বয়োবৃদ্ধদের অতিরিক্ত ব্যবহারের প্রধান শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকি:
    চক্ষু ও শারীরিক সমস্যা: দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকায় চোখে তীব্র চাপ, শুষ্কতা, দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া এবং ঘাড়-পিঠে ব্যথার প্রাদুর্ভাব।
    ঘুমের চরম ব্যাঘাত: নীল আলোর (Blue Light) প্রভাবে রাতে স্বাভাবিক ঘুম না হওয়া, যা উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
    একাকীত্ব ও মানসিক অস্থিরতা: ভার্চুয়াল জগতে বেশি সময় দিলে পরিবারের মানুষের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ কমে যায়, ফলে একাকীত্ব ও অস্থিরতা আরও তীব্র হয়।
    অনলাইন প্রতারণার ঝুঁকি: প্রযুক্তিতে তুলনামূলক নতুন হওয়ায় ভুয়া সংবাদ, সাইবার প্রতারণা ও ভুল তথ্যে বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
    বয়োবৃদ্ধদের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ জীবনধারা
    বয়াবৃদ্ধদের জন্য স্মার্টফোন পুরোপুরি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং এটি ব্যবহারে ভারসাম্য আনা জরুরি। সারাদিনে সর্বমোট ১ থেকে ২ ঘণ্টার বেশি স্মার্টফোন ব্যবহার না করাই শ্রেয়। দিনের বাকি সময় পর্যাপ্ত বিশ্রাম, প্রাতঃভ্রমণ বা বিকেলে হাঁটাচলা, বই পড়া এবং পরিবারের নাতি-নাতনি ও সদস্যদের সাথে সরাসরি গল্পগুজব করে কাটানো উচিত।
    আমাদের করণীয়
    একটি কথা আমাদের সর্বদা মনে রাখা দরকার— “স্মার্টফোন আমাদের জীবনের একটি হাতিয়ার মাত্র; এটি যেন কখনই আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রক না হয়ে ওঠে।” তরুণেরা যদি তাদের মূল্যবান সময় ও শক্তিকে স্বপ্নের পেছনে ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রয়োগ করে এবং বয়োবৃদ্ধরা যদি প্রজ্ঞা, পারিবারিক বন্ধন ও আত্মিক শান্তিতে মনোযোগ দেন, তবেই সমাজে পুনরায় মানসিক শান্তি ও স্থায়িত্ব ফিরে আসবে। আসুন, আমরা স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে বাস্তবের প্রিয় মানুষদের দিকে তাকাই।
    লেখকের অনুকথা: আমি নিজে একজন তরুণ শিক্ষক হিসেবে গভীর দায়িত্ববোধ ও শ্রদ্ধা বোধ থেকেই আমাদের শ্রদ্ধেয় বয়াবৃদ্ধ ও অনুজ তরুণদের উদ্দেশ্যে এই কথাগুলো লিখলাম। আশা করি, কেউ এটিকে ব্যক্তিগত সমালোচনা হিসেবে না নিয়ে বিষয়টির গভীরতা ও সামাজিক প্রভাব উপলব্ধি করবেন।
    লেখক:
    সোহান শাহরিয়ার
    সহকারী শিক্ষক