মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা: ভেতরের ক্ষত, বাইরের চাপ ও উত্তরণের পথ

প্রাথমিক শিক্ষা একটি দেশের সামগ্রিক শিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর। বলা হয়ে থাকে, প্রাথমিক বিদ্যালয়েই একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মিত হয়। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতায় সাবলীল বাংলা ও ইংরেজি পাঠ এবং মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার পথে কিছু গভীর সামাজিক ব্যাধি, অভিভাবকীয় উদাসীনতা এবং শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদার সংকট বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাইরে থেকে যা চকচকে দেখায়, ভেতরের গল্পটা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল এবং চ্যালেঞ্জিং।
পারিবারিক ভাঙন ও অভিভাবকীয় উদাসীনতা: ঝরে পড়ার মূল কারণ
মানসম্মত শিক্ষার প্রথম শর্ত হলো শিক্ষার্থীর নিয়মিত উপস্থিতি এবং সুস্থ মানসিক বিকাশ। কিন্তু বর্তমানে প্রান্তিক পর্যায়ের একটা বড় অংশের বাস্তব চিত্র চরম হতাশাজনক।
অনুপস্থিতি ও পুষ্টিহীনতা: বহু শিশু নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে না। এমনকি এক কাপড়ে, খালি পেটে, না খেয়েই অনেকে ক্লাসে চলে আসে। ক্ষুধার্ত পেটে যে মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা সম্ভব নয়—এই ন্যূনতম বোধটুকুও তৈরি হচ্ছে না।
প্যারেন্টিং বা অভিভাবকত্বের অভাব: জীবিকার তাগিদে বাবা-মা পাড়ি জমিয়েছেন ঢাকায়, আর সন্তান পড়ে আছে গ্রামে দাদা-দাদী বা নানী-দাদীর কাছে। ফলে এই শিশুরা এক প্রকার অভিভাবকহীনভাবেই বেড়ে উঠছে।
অসচেতনতা: প্রায় ৮০% অভিভাবকই শিক্ষার গুরুত্ব নিয়ে অসচেতন। বিদ্যালয়ে তাদের সন্তান আজ কী শিখলো, কোনো বাড়ির কাজ আছে কি না—তার খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজনও তারা বোধ করেন না। মা সমাবেশ বা অভিভাবক সমাবেশে ডাকলে তাদের আসার চরম অনীহা দেখা যায়, আবার শিক্ষকদের পক্ষ থেকে ‘হোম ভিজিট’ বা গৃহ পরিদর্শনে গেলেও অনেক সময় তাদের পাওয়া যায় না।
নৈতিকতার অবক্ষয় ও কিশোর অপরাধের ঝুঁকি
পারিবারিক শাসনের অভাব এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাবা-মা সাথে না থাকায় অনেকেই এক প্রকার বেপরোয়া জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। এর সাথে যোগ হয়েছে মারাত্মক ‘মোবাইল আসক্তি’। এই বয়সেই শিশুরা মোবাইলের মাধ্যমে বিভিন্ন অপসংস্কৃতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রেণিকক্ষে—শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা বা মান্য করার মানসিকতা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে চরম নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের অভাব।
শিক্ষকদের আন্তরিকতা বনাম কাঠামোগত চাপ
একথা সত্য যে শতভাগ শিক্ষক হয়তো সমান আন্তরিক নন, তবে অধিকাংশ শিক্ষকই তাদের সীমিত সুযোগ-সুবিধা এবং প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও নিজের সেরাটা দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের এই চেষ্টার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় অতিরিক্ত কাজের চাপ।
শিক্ষকদের মূল কাজ পাঠদান হলেও তাদের উপবৃত্তি, নির্বাচন, আদমশুমারি, ভোটার তালিকা প্রণয়নসহ নানাবিধ দাপ্তরিক ও অ-প্রাতিষ্ঠানিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। অথচ সাধারণ মানুষের ধারণা—শিক্ষকরা বোধহয় অলস বসে বসে বেতন পান এবং সারা বছর শুধু ছুটি কাটান! কাজের এই সঠিক স্বীকৃতি না পাওয়াটা একজন শিক্ষকের জন্য চরম মানসিক যন্ত্রণার।
সামাজিক অবজ্ঞা ও আত্মমর্যাদার সংকট
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, সমাজ আজ প্রাথমিক শিক্ষকদের যোগ্য সম্মান দিতে কার্পণ্য করছে। সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রায়শই শিক্ষকদের সাথে অবজ্ঞাসূচক আচরণ করেন।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির (SMC) কোনো কোনো সদস্য, যিনি হয়তো শিক্ষাগত যোগ্যতায় একজন মাধ্যমিক পাস মানুষ, তিনিও একজন পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট (উচ্চশিক্ষিত) শিক্ষকের আত্মমর্যাদায় আঘাত করতে দ্বিধা করেন না। শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে মগ্ন বা অফিসের কোনো জরুরি অনলাইন কাজে ব্যস্ত, তখন তার সাথে কথা না বলতে পারলেই জবাবদিহিতা করতে হয়, এমনকি সবার সামনে অপমানিতও হতে হয়। একজন মানুষ গড়ার কারিগরের জন্য এর চেয়ে অবমাননাকর আর কিছু হতে পারে না।
উত্তরণের উপায় ও সম্ভাবনা
এই সংকটগুলো রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়, তবে সঠিক সমন্বিত উদ্যোগ নিলে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা অবশ্যই সম্ভব। এর জন্য প্রধানত চারটি জায়গায় পরিবর্তন দরকার:
বাইরের চাপমুক্ত কর্মপরিবেশ: শিক্ষকদের পাঠদানের বাইরে অন্য কোনো অতিরিক্ত দাপ্তরিক কাজে জড়ানো বন্ধ করতে হবে। তাঁদের প্রধান কাজ হওয়া উচিত শুধুই শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাদান।
শিক্ষকের সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা: একজন শিক্ষকের মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রীয়ভাবে। পরিচালনা কমিটির রাজনৈতিক বা অপেশাদার হস্তক্ষেপ বন্ধ করা জরুরি। কোনো শিক্ষককে যেন সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে হেনস্থার শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
পারিবারিক সচেতনতা ও কাউন্সিলিং: শুধু মা সমাবেশ নয়, প্রয়োজনে এলাকাভিত্তিক উঠান বৈঠক করে অভিভাবকদের বোঝাতে হবে যে, সন্তানের পড়াশোনা ও নৈতিক চরিত্র গঠনের মূল দায়িত্ব তাদেরও। মোবাইল আসক্তি দূর করতে বিদ্যালয় ও পরিবারকে একসাথে কাজ করতে হবে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্যই হলো শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করা এবং একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে পরিদর্শকদের আচরণে দুটি ভিন্ন চিত্র দেখা যায়।
একটি আদর্শ একাডেমিক পরিদর্শনে পরিদর্শকরা মেন্টর বা সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করেন। তারা শ্রেণীকক্ষে এসে সাধারণত নিম্নলিখিত বিষয়গুলো দেখেন এবং মূল্যায়ন করেন:
সাবলীল পাঠ: শিক্ষার্থীরা কতটুকু সহজে ও সাবলীলভাবে পড়তে ও বুঝতে পারছে।
সবল দিক: শিক্ষকের পাঠদানের কোন পদ্ধতিগুলো কার্যকর এবং প্রশংসনীয় তা চিহ্নিত করা।
দুর্বল দিক: শ্রেণী ব্যবস্থাপনায় বা পাঠদানে কোথায় ঘাটতি বা ত্রুটি রয়েছে তা নিরূপণ করা।
শ্রেণীকক্ষের পাঠদান শেষে তারা শিক্ষকদের উৎসাহিত করেন এবং অফিস কক্ষে এসে আলাদাভাবে বসেন। সেখানে তারা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন এবং ‘উন্নয়নের ক্ষেত্র’ (Areas for Improvement) গুলো সুনির্দিষ্ট করে বুঝিয়ে দেন, যা শিক্ষকদের পেশাগত মান বাড়াতে সাহায্য করে।
এর বাইরে কিছু পরিদর্শকের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং দুঃখজনক চিত্র দেখা যায়। তারা পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে ব্যক্তিগত অহমিকা বা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন:
শ্রেণী কক্ষে শিক্ষার্থীদের সামনেই শিক্ষকদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন, যা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনে শিক্ষকের মর্যাদা ও সম্মানকে ক্ষুণ্ন করে।
গঠনমূলক পরামর্শ দেওয়ার পরিবর্তে তারা ভুল ধরা এবং ধমক দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে আসেন। এতে বিদ্যালয়ে একটি ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়।
পেশাগত মানোন্নয়নের চেয়ে শিক্ষকদের কীভাবে ছোট করা যায় বা প্রশাসনিক ক্ষমতা দেখানো যায়, সেদিকেই তাদের মনোযোগ বেশি থাকে।
পরিদর্শন হওয়া উচিত সহযোগিতামূলক, শাস্তিমূলক বা অপমানজনক নয়। শিক্ষকদের আত্মসম্মান ও সামাজিক মর্যাদা বজায় রেখে যদি গঠনমূলক সমালোচনা ও সঠিক নির্দেশনা দেওয়া হয়, তবেই প্রাথমিক শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক যদি আবার সেই চিরন্তন শ্রদ্ধা, ভক্তি ও স্নেহের জায়গায় ফিরিয়ে আনা যায় এবং শিক্ষকদের যদি বাহ্যিক মানসিক চাপ থেকে মুক্ত রেখে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়, তবেই দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব। শিক্ষকদের অবজ্ঞায় রেখে কোনো জাতি কোনোদিন উন্নত ও শিক্ষিত সমাজ গঠন করতে পারেনি, পারবেও না।

সোহান শাহরিয়ার
শিক্ষক