অনিয়ন্ত্রিত কিন্ডারগার্টেন ও নূরানী মাদরাসা: সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা কি হুমকির মুখে?

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার সমান্তরালে কিন্ডারগার্টেন ও নূরানী মাদরাসার সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। যদিও এসব প্রতিষ্ঠান এনসিটিবি (NCTB) কর্তৃক প্রকাশিত পাঠ্যবই ব্যবহার করছে যা সরকার সরবরাহ করছে বছরের প্রথম দিন ই!তবুও পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা সরকারি কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করছে না। এই অনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাব্যবস্থা দেশের মূলধারার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
১. নীতিমালার তোয়াক্কা না করার সংস্কৃতি
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক ক্যালেন্ডার, ছুটির তালিকা এবং বিশেষ নির্দেশনা মেনে চলে। কিন্তু কিন্ডারগার্টেনগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ছুটির অনিয়ম: সরকারি ছুটির দিনে এমনকি শনিবারও (যা বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছুটি) অনেক কিন্ডারগার্টেন ক্লাস চালু রাখে।
নির্দেশনা অমান্য: পবিত্র রমজান মাসে যখন সরকারি নির্দেশনায় প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ থাকে, তখন অনেক কিন্ডারগার্টেন ও নূরানী মাদরাসা পরীক্ষা বা ক্লাসের নামে কার্যক্রম চালিয়ে যায়।
শ্রম আইন ও ছুটি: ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্ট হিসেবে সরকারি শিক্ষকরা যেসব সুবিধা পান বা শিক্ষার্থীরা যে নির্ধারিত ছুটি পায়, বেসরকারি এই প্রতিষ্ঠানগুলো তা মানছে না, যা কোমলমতি শিশুদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে।সাধারণ জনগণের কাছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি ভ্রান্ত ধারণার জন্ম দিচ্ছে।
২. সরকারি প্রাথমিকে শিক্ষার্থী সংকটের কারণ:
যখন একটি কিন্ডারগার্টেন সরকারি নিয়ম না মেনে অতিরিক্ত ক্লাস বা বিশেষ ‘সুবিধা’র প্রলোভন দেখায়, তখন অভিভাবকরা সেদিকেই ঝুঁকে পড়েন। ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’র (নির্ধারিত এলাকা) শিক্ষার্থীরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে চলে যাচ্ছে। এতে সরকারি বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে।
৩. নূরানী মাদরাসার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার
দেশের আনাচে-কানাচে কোনো প্রকার অনুমোদন বা নির্দিষ্ট মানদণ্ড ছাড়াই গড়ে উঠছে নূরানী মাদরাসা। শিক্ষার মান যাচাই বা অবকাঠামোগত কোনো সঠিক তদারকি না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রাথমিক স্তরের এই বহুধা বিভক্তি জাতীয় শিক্ষানীতির মূল লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করছে।
৪. প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও কঠোর নজরদারি
শিক্ষাক্ষেত্রে এই বিশৃঙ্খলা দূর করতে এখন সময়ের দাবি হলো একটি সুষ্ঠু ও কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করা। এক্ষেত্রে নিচের পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে:
ভৌগোলিক সীমারেখা নির্ধারণ: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এরিয়ার মধ্যে নতুন কোনো বেসরকারি প্রাথমিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমতি দেওয়া যাবে না।বর্তমানে থাকলে তা অন্যত্র সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করা।
প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নির্ধারণ: প্রতিটি ইউনিয়নে একটির বেশি কিন্ডারগার্টেন বা নূরানী মাদরাসা থাকবে না—এমন কঠোর আইন করা প্রয়োজন। একইভাবে উপজেলা পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৪টি কিন্ডারগার্টেন ও ৫টি নূরানী মাদরাসার কোটা নির্ধারণ করে দেওয়া যেতে পারে।
একীভূত ছুটির ক্যালেন্ডার: সরকারি বা বেসরকারি—সব প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে সরকারের বার্ষিক ছুটির তালিকা ও সাপ্তাহিক ছুটি মেনে চলতে হবে।
কঠোর নজরদারি: উপজেলা শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনো প্রতিষ্ঠান সরকারি নির্দেশনার বাইরে ক্লাস বা পরীক্ষা নিতে না পারে।আদেশ অমান্য করলে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা এবং প্রতিষ্ঠানের রেজিষ্ট্রেশন বাতিল করা।
পরিশেষে বলতে চাই,
একটি দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা হওয়া উচিত একমুখী এবং সুশৃঙ্খল। কিন্ডারগার্টেন ও নূরানী মাদরাসাগুলো যদি সরকারি বইয়ের সুবিধা নেয়, তবে তাদের অবশ্যই সরকারি প্রশাসনিক নিয়মও মানতে হবে। সরকার যদি দ্রুত এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করে, তবে অদূর ভবিষ্যতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী শূন্য হয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

আমার এই প্রস্তাবনাগুলো শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। একটি সুসংগত নীতিমালা কেবল সরকারি বিদ্যালয়কেই রক্ষা করবে না, বরং শিশুদের শৈশবকেও অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ থেকে মুক্তি দেবে।
সোহান শাহরিয়ার
সহকারী শিক্ষক
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়