দান নয়, আগে ঋণ পরিশোধ: ন্যায়, দায়িত্ব ও ইসলামের ভারসাম্য

মানুষ হিসেবে আমরা সহমর্মিতা, দানশীলতা ও মানবকল্যাণের কথা শুনলেই অনুপ্রাণিত হই। সমাজে অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো নিঃসন্দেহে একটি মহৎ কাজ। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়—যদি একজন মানুষের নিজের ওপর ঋণ থাকে, তাহলে কি তার জন্য দান করা বেশি জরুরি, নাকি সেই ঋণ পরিশোধ করা? ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট, বাস্তবমুখী এবং ন্যায়ভিত্তিক।
প্রথমত, ইসলাম মানুষের অধিকারের (হক্কুল ইবাদ) বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। পবিত্র কুরআন শরীফ-এর সূরা আল-বাকারা (২:২৮২) আয়াতে ঋণ লেনদেন লিখে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কুরআনের সবচেয়ে দীর্ঘ এই আয়াতটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি একটি শক্ত বার্তা—ঋণ একটি গুরুতর দায়িত্ব, যা অবহেলা করার সুযোগ নেই। অর্থাৎ, ইসলামে আর্থিক লেনদেন ও দায়বদ্ধতা নৈতিকতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
দ্বিতীয়ত, হাদিসে ঋণের গুরুত্ব আরও জোরালোভাবে উঠে এসেছে। সহীহ মুসলিম-এ বর্ণিত হয়েছে যে, একজন শহীদের সব গুনাহ ক্ষমা করা হলেও ঋণ ক্ষমা করা হয় না। এই হাদিসের তাৎপর্য গভীর—মানুষের অধিকার আল্লাহ তায়ালা নিজে ক্ষমা করেন না, যতক্ষণ না সেই ব্যক্তি তার প্রাপ্য ফিরে পায়। অন্যদিকে সুনান আত-তিরমিজি-এর বর্ণনায় বলা হয়েছে, “মুমিনের আত্মা তার ঋণের কারণে ঝুলে থাকে, যতক্ষণ না তা পরিশোধ করা হয়।” অর্থাৎ, ঋণ কেবল দুনিয়ার দায় নয়, আখিরাতের সাথেও এটি সরাসরি সম্পর্কিত।
ইসলামের মহানবী মুহাম্মদ (সা.) নিজেই এ বিষয়ে বাস্তব উদাহরণ স্থাপন করেছেন। সহীহ বুখারী-তে উল্লেখ রয়েছে, তিনি প্রথমদিকে এমন ব্যক্তির জানাজা পড়তেন না, যার ওপর ঋণ ছিল এবং তা পরিশোধের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এটি ছিল একটি শক্ত সামাজিক বার্তা—ঋণকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না, এবং এটি সমাজে দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার একটি কার্যকর পদ্ধতি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—দান (সদকা) ও ঋণ পরিশোধের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য। দান একটি নফল ইবাদত, যার মাধ্যমে মানুষ অতিরিক্ত সওয়াব অর্জন করে। কিন্তু ঋণ পরিশোধ একটি বাধ্যতামূলক দায়িত্ব, যা অন্য মানুষের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। ইসলামী ফিকহের আলোকে বলা যায়, একটি নফল ইবাদত কখনোই ফরজ বা ওয়াজিব দায়িত্বের বিকল্প হতে পারে না। তাই কেউ যদি ঋণ রেখে দান করে, তাহলে সে হয়তো সওয়াব পাবে, কিন্তু ঋণের দায় থেকে মুক্তি পাবে না।
বর্তমান সমাজে আমরা প্রায়ই একটি ভুল প্রবণতা দেখি—মানুষ সামাজিক সম্মান বা আত্মতৃপ্তির জন্য দান করতে আগ্রহী, কিন্তু নিজের ওপর থাকা ঋণ পরিশোধে গাফিলতি করে। এটি কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ভুল নয়, বরং নৈতিক ও সামাজিক দিক থেকেও ক্ষতিকর। কারণ, এর ফলে অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন হয় এবং সমাজে অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়।
ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। এখানে দানকে উৎসাহিত করা হয়েছে, আবার একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন প্রকৃত মুমিনের উচিত—প্রথমে নিজের ওপর থাকা সকল আর্থিক দায়বদ্ধতা, বিশেষ করে ঋণ পরিশোধ করা; এরপর সামর্থ্য অনুযায়ী দান-সদকার মাধ্যমে সমাজে অবদান রাখা।
সবশেষে বলা যায়, দান ও ঋণ—উভয়ই ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তবে তাদের অগ্রাধিকার আলাদা। ঋণ পরিশোধ হলো ন্যায় ও দায়িত্বের প্রতিফলন, আর দান হলো উদারতা ও সহমর্মিতার প্রকাশ। তাই একজন সচেতন মুসলমানের জন্য সঠিক পথ হলো—প্রথমে ন্যায় প্রতিষ্ঠা, তারপর উদারতা প্রদর্শন