ফেসবুক মনিটাইজেশন: সৃজনশীলতা ও নৈতিকতার সংকট

বর্তমান সময়ে ফেসবুক কেবল একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং তথ্যের এক বিশাল ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে। সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা, অনিয়ম, দুর্নীতি তুলে ধরা থেকে শুরু করে হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার মতো মহৎ কাজে ফেসবুকের ইতিবাচক ভূমিকা অনস্বীকার্য। মানুষ তার আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি বা গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ মুহূর্তেই প্রিয়জনদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। সম্প্রতি ফেসবুকের ‘মনিটাইজেশন’ বা কনটেন্ট থেকে অর্থ উপার্জনের বিষয়টি যেমন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে, তেমনি তৈরি করেছে এক গভীর সামাজিক সংকট।
ফেসবুকে মানসম্মত কনটেন্ট তৈরি করে আয় করা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু বিপত্তিটা ঘটছে আয়ের নেশায় কনটেন্টের গুণগত মান এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে বিসর্জন দেওয়া নিয়ে। মনিটাইজেশন চালু রাখার অন্যতম শর্ত হলো নিয়মিত অ্যাক্টিভ থাকা বা ভিডিও আপলোড করা। আর এই ‘নিয়মিত’ থাকার প্রতিযোগিতায় নেমে অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর জীবনের অতি ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোকে জনসম্মুখে নিয়ে আসছেন।
সকাল থেকে রাত অব্দি একজন মানুষ কী করছেন, অফিসে কী খাচ্ছেন কিংবা বাজারে গিয়ে কী কিনছেন—সবই এখন ভিডিওর বিষয়বস্তু। এমনকি পারিবারিক একান্ত আলাপচারিতা কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোও ‘কাপল ব্লগিং’-এর নামে বাজারজাত করা হচ্ছে। এসব ভিডিও যেমন বিরক্তির উদ্রেক করছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মনে তৈরি করছে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া। আমরা হয়তো আয়ের কথা ভাবছি, কিন্তু একবারও কি ভেবে দেখছি—আমাদের এসব কর্মকাণ্ড পরবর্তী প্রজন্মের ওপর কী প্রভাব ফেলছে? আমরা কি অজান্তেই এক প্রদর্শনকামী ও অন্তঃসারশূন্য প্রজন্মের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছি না?
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো কনটেন্টের বিষয়বস্তু। বর্তমানে অনেক ক্রিয়েটর ‘বউ-শাশুড়ি দ্বন্দ্ব’ কিংবা পারিবারিক কলহকে বিনোদন হিসেবে উপস্থাপন করছেন। আবার কেউ কেউ কৌশলে ‘কীভাবে চুরি করতে হয়’ বা অনৈতিক কাজ করতে হয়—এমন সব ভিডিও তৈরি করছেন যা সমাজের নৈতিক অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করছে।
ফেসবুক থেকে যদি সত্যিই রেমিট্যান্স বা অর্থ অর্জন করতে হয়, তবে সেখানে মেধা ও সৃজনশীলতার প্রতিফলন থাকা জরুরি। আমাদের শিক্ষক সমাজ যদি তাদের পাঠদান বা শিক্ষামূলক ভিডিও শেয়ার করেন, চিকিৎসকরা যদি স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক পরামর্শ দেন, তবে সমাজ প্রকৃতপক্ষে উপকৃত হবে। যেকোনো পেশার মানুষই তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে গঠনমূলক কিছু তুলে ধরতে পারেন।
পরিশেষে, ফেসবুক মনিটাইজেশন যেন কেবল সস্তা জনপ্রিয়তা বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বিক্রির মাধ্যম না হয়। সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে সৃজনশীল এবং শিক্ষামূলক কনটেন্ট নির্মাণের বিকল্প নেই। আসুন, আয়ের পাশাপাশি দায়বদ্ধতার কথা ভাবি। ভালো কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে জাতিকে কিছু শিখতে সাহায্য করি এবং একইসাথে নিজেকে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলি। তবেই প্রযুক্তির এই আশীর্বাদ আমাদের জন্য সার্থক হবে।

সোহান শাহরিয়ার
সহকারী শিক্ষক
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়